যুদ্ধের ছায়ায় তেহরান—সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার গল্প
দেশ লাইভ নিউজ ডেস্ক :
ইরানের রাজধানী তেহরানে চলমান অস্থিরতার মাঝে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। বোমাবর্ষণ, অনিশ্চয়তা আর আতঙ্কের মধ্যেও তারা ধরে রেখেছেন জীবনের আশা, স্মৃতি আর ভালোবাসা।
৬৩ বছর বয়সী আকরাম এই ধ্বংসযজ্ঞ দেখে ফিরে যান আশির দশকের ইরান-ইরাক যুদ্ধের স্মৃতিতে। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি তাকে ব্যথিত করলেও প্রযুক্তির অগ্রগতির কারণে দ্রুত খবর ছড়িয়ে পড়ছে বলে তিনি মনে করেন। নিজের দেশের লড়াইকে তিনি দেখেন সম্মানের চোখে।
কোরিয়ান ভাষার শিক্ষক রেজভানেহ হারিয়েছেন তার জীবিকার পথ। ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় থেমে গেছে তার অনলাইন ক্লাস। আয় বন্ধ, আর চারপাশে বিমান হামলার আতঙ্ক—সব মিলিয়ে তার রাতগুলো কাটছে চরম উদ্বেগে। বই আর সিনেমার মধ্যে খুঁজে নিচ্ছেন সাময়িক শান্তি।
৩৯ বছর বয়সী সারা এখনো তেহরানেই আছেন। প্রিয়জনকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছে দিতে গিয়ে হঠাৎ পরিস্থিতির অবনতি হলে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ফিরতে হয় তাকে। শহর ছাড়ার সুযোগ থাকলেও শেকড়ের টানে তিনি রয়ে গেছেন। তার প্রত্যাশা—দেশে ফিরুক একতা আর স্বাভাবিক জীবন।
শিল্পী সাদরা এখনো বহন করছেন বিস্ফোরণের তীব্র শব্দের স্মৃতি। তার কাছে যুদ্ধ মানে এক দীর্ঘস্থায়ী মানসিক ক্ষত। তবে প্রতিদিনের সূর্যোদয় তাকে বেঁচে থাকার শক্তি জোগায়। তিনি বিশ্বাস করেন—সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে ইরান টিকে থাকবে।
আজাদেহর দিন কাটছিল পোষা পাখিদের যত্নে। হঠাৎ বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে তার ঘর। আত্মীয়দের খোঁজ নিতে মোবাইল মেসেজই এখন ভরসা। স্মৃতিবিজড়িত ঘর আর অবলা প্রাণীদের ছেড়ে কোথাও যেতে চান না তিনি।
ফেব্রুয়ারিতে তেহরানে হামলা শুরু হলে বিশ্বজুড়ে আলোচনায় ছিল বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন। কিন্তু সেই আলোচনার আড়ালে চাপা পড়ে যায় সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম। ইরানি-আমেরিকান সাংবাদিক মরিয়ম রহমানিয়ান তুলে ধরেছেন সেই অজানা গল্পগুলো।
সালেমেহ, একজন মানবসম্পদ ব্যবস্থাপক, হামলার দিন কর্মস্থলে ছিলেন। স্বাভাবিক ৪০ মিনিটের পথ পাড়ি দিতে তার লেগেছিল তিন ঘণ্টা। এখন সামান্য শব্দেও তিনি আতঙ্কিত হয়ে ওঠেন। তার মতে, শহরের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ভেঙে পড়েছে।
মবিনার স্বামী জার্মানিতে থাকেন। তারও যাওয়ার প্রস্তুতি ছিল, কিন্তু যুদ্ধ সব পরিকল্পনা বদলে দেয়। স্বামীর দেওয়া আংটি শক্ত করে ধরে তিনি খুঁজে পান সাহস। এখন তিনি মানুষের মাঝে খবর আদান-প্রদানের একটি মাধ্যম হয়ে উঠেছেন।
বিদেশ যাওয়ার ভিসা হাতে পেয়েও মাহতাব আটকে পড়েছেন এই যুদ্ধের মধ্যে। প্রথমে ভয় পেলেও এখন তিনি বিভিন্ন গোলার শব্দ চিনে নিতে পারেন। নওরোজের কেনাকাটায় খুঁজে নিচ্ছেন সামান্য আনন্দ, তবে ঐতিহ্যবাহী নিদর্শনের ক্ষতি তাকে কষ্ট দেয়।
লেখক সামা মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যের মানুষের জীবনে কষ্ট যেন নিত্যসঙ্গী। যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞার চাপে তিনি দিশেহারা। তেহরান ছাড়ার কোনো পথ নেই, আর দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত তাকে হতাশ করে তুলছে।
সবচেয়ে মর্মান্তিক গল্প বাহারেহর। মার্চ মাসের এক হামলায় তিনি হারিয়েছেন পরিবারের ১২ জন সদস্যকে। তার ১৭ বছর বয়সী ভাই স্বপ্ন দেখত মহাকাশচারী হওয়ার। আজ তার পরিবারের কোনো স্মৃতিচিহ্নও অবশিষ্ট নেই।
৪০ বছর ধরে ইরানে বসবাসরত আফগান নাগরিক আলী আবারও দেখছেন যুদ্ধের ভয়াবহতা। আশপাশের মানুষ পালিয়ে গেলেও তিনি যত্ন নিচ্ছেন তাদের ফেলে যাওয়া গাছগুলোর। মসজিদে গিয়ে প্রার্থনা করেন সবার নিরাপত্তার জন্য। এক চিলতে শান্তির আশায় এখনো অপেক্ষায় আছেন তিনি।

No comments:
Post a Comment